আসসালাম আ’লাইকুম। আশা করি আল্লাহর অশেষ রহমতে সবাই ভাল আছেন। আমরা জন্ম নিবন্ধন বিষয়ে কমবেশি সবাই জানি।জন্ম নিবন্ধন বের করা সম্পর্কে আর্টিকেলটিতে জেনে নেয়া যাক। 

একজন মানুষের প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিজন্ম হলো নিবন্ধন ।জন্ম নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে । একটি জরিপ থেকে জানা গেছে, বর্তমানে আমাদের দেশে  ১৬ কোটি জনগণের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন ও জন্ম সনদ তৈরি করা হয়েছে ১৫ কোটি মানুষের। অর্থাৎ এখনও প্রায় এক কোটি মানুষের এটি করা হয়নি।  প্রত্যেক নাগরিকের জন্য জন্ম নিবন্ধন  একান্ত জরুরী। তাই আজ  আমরা জন্ম নিবন্ধন সম্পর্কে এই আর্টিকেলটিতে জানবো। 

 

জন্ম নিবন্ধন :

জন্ম নিবন্ধন আমাদের প্রত্যেকের প্রাথমিক পরিচয় পত্র। প্রাথমিক জীবনে  আমাদের প্রত্যেকের জন্ম নিবন্ধন সনদ দরকার হয় । জন্ম নিবন্ধন হলো জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ (২০০৪ সনের ২৯ নং আইন) এর আওতায় একজন মানুষের নাম, লিঙ্গ, জন্মের তারিখ ও স্থান, বাবা-মায়ের নাম, তাদের জাতীয়তা এবং স্থায়ী ঠিকানা নির্ধারিত নিবন্ধক কর্তৃক রেজিস্টারে লেখা বা কম্পিউটারে এন্ট্রি প্রদান এবং জন্ম সনদ প্রদান করা। 

কেন জন্ম নিবন্ধন প্রয়োজন হয়?

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৬সাল থাকে কার্যকর হয়।  জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইনের নিয়ম অনুযায়ী কোনো শিশু জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে অবশ্যই জন্ম নিবন্ধন বাধতামূলক। এমনকি২বছর এর মধ্যে জন্ম নিবন্ধন নাকরলে পিতা মাতাকে জরিমানা দিতে হয়। জাতীয় পরিচয়পত্র বা ন্যাশনাল আইডি কার্ড হাতে না পাওয়া পর্যন্ত জন্ম সনদ পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করে।তাই অনেক জায়গাতে জন্ম নিবন্ধন প্রয়োজন বা ব্যবহার  হয়।

 

  • বয়স যদি ১৮ এর কম হয় ও এনআইডি কার্ড না থাকে, তাহলে পাসপোর্ট এর আবেদন করা জন্য জন্ম সনদ প্রয়োজন । 

  • যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে তো জন্ম নিবন্ধন সনদ দরকার হয় ।

  • এমনকি বিয়ের নিবন্ধনেও ক্ষেত্রে জন্ম সনদ ব্যবহার করা হয়। 

  • ভোটার আইডি কার্ড এর আবেদনের সময় জন্ম নিবন্ধন  প্রয়োজন হয় ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন  প্রয়োজন হয়।

 

জন্ম নিবন্ধন করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

 

প্রথমেই কিছু কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে জন্ম নিবন্ধনের জন্য। এর জন্য বিভিন্ন বয়সের লোকদের জন্য কাগজপত্রেও ভিন্নতা রয়েছে।

 

শিশুর  বয়স ০ থেকে  ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করতে হয়।জন্ম নিবন্ধন করতে যে কাগজপত্রগুলো প্রয়োজন তা হলো-

 

  • অনলাইনে আবেদনকৃত ফর্মের প্রিন্ট কপি।

  • ইপিআই (টিকা) কার্ড বা হাসপাতালের ছাড়পত্র

  • বাসার হোল্ডিং নম্বর এবং হাল সনের হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদ

  • আবেদনকারী পিতা-মাতা/ অভিভাবকের মোবাইল নম্বর

  • পিতা ও মাতার ডিজিটাল বা অনলাইন জন্ম নিবন্ধন কপি (যদি থাকে)

  • পিতা ও মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি (যদি থাকে)

 

শিশুর  বয়স ৪৬ দিন থেকে ৫ বছরের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করতে যে  সব কাগজপত্রই লাগবে তা হলো-

 

  • অনলাইনে আবেদনকৃত ফর্মের প্রিন্ট কপি।

  • ইপিআই (টিকা) কার্ড / স্বাস্থ্য কর্মীর প্রত্যায়নপত্র (স্বাক্ষর ও সীলসহ)

  • পিতা ও মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি (যদি থাকে)

  • পিতা ও মাতার অনলাইন জন্ম নিবন্ধন কপি (যদি থাকে)

  • বাসার হোল্ডিং নম্বর এবং হাল সনের হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদ

  • বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রত্যয়নপত্র (স্বাক্ষর ও সীলসহ)

  • আবেদনকারী পিতা-মাতা/ অভিভাবকের মোবাইল নম্বর

৫ বছরের উপরে যে কোনো ব্যক্তির জন্ম নিবন্ধন করতে যে  সব কাগজপত্রই লাগবে তা হলো-

 

  • অনলাইনে আবেদনকৃত ফর্মের প্রিন্ট কপি।

  • ব্যক্তির এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

  • বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল স্বীকৃত এমবিবিএস বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী চিকিৎসক-এর নিকট থেকে প্রত্যয়ন পত্র।

  • পিএসসি(প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী), জেএসসি (জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট) বা এসএসসি (মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট)।

  • বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষাতেই বাবা-মায়ের অনলাইনে নিবন্ধিত জন্ম সনদ।

  • বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র।

  • জন্মস্থান বা স্থায়ী ঠিকানা প্রমাণের সাপেক্ষে বাবা/মা/দাদা/দাদির স্বনামে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখিত জায়গার বিপরীতে নবায়নকৃত কর প্রদানের প্রমাণপত্র ।অথবা, নদীভাঙন/কোনো কারণে স্থায়ী ঠিকানা বিলুপ্ত হলে জমি/বাড়ি ক্রয়ের দলিল, খাজনা ও কর প্রদানের রশিদ।অথবা, বসবাসের স্থান প্রমাণের সাপেক্ষে পৌরসভার চেয়ারম্যান বা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র।

 

অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করার নিয়ম:

জন্ম নিবন্ধন এর আবেদন অনলাইনে করা যায়। অনলাইনে আবেদন বেশ সহজ।

সঠিক নিয়মে এবং বোঝার সুবিধার্থে জন্ম নিবন্ধন এর আবেদনের প্রক্রিয়াকে ধাপে ধাপে বর্ণনা করা হয়েছে-

 

১ম ধাপ: 

অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন এর জন্য আবেদন করতে  https://bdris.gov.bd/এই লিংকে প্রবেশ করুন।

 

২য় ধাপ:

ওয়েবসাইটে প্রবেশের পর জন্ম সনদ সংগ্রহের স্থান হিসেবে তিনটি অপশন পাবেন জন্ম স্থান, স্থায়ী ঠিকানা, ও বর্তমান ঠিকানা। এর পাশে থাকা বক্সে টিক মার্ক দিন। এছাড়া সুবিধামত জন্ম স্থান, স্থায়ী ঠিকানা, ও বর্তমান ঠিকানা নির্বাচন করা যাবে।

 

৩য় ধাপ: 

জন্ম নিবন্ধন অনলাইন আবেদন এর এই পর্যায়ে আবেদনকারীকে একটি ফর্ম পূরণ করতে হবে। এই ফর্মে মূলত আবেদনকারীর জন্ম সম্পর্কিত তথ্য প্রদান করতে হবে। এই ফর্মে যার জন্ম সনদ এর আবেদন করা হচ্ছে তার সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রদান করতে হবে সেগুলো হলো-

 

  • ফার্স্ট ও লাস্ট নেম – বাংলা ও ইংরেজি, উভয় ভাষায়

  • জন্ম তারিখ, যা জন্ম সনদে উল্লেখ থাকবে

  • পিতামাতার কত নাম্বার সন্তান সে তথ্য ও লিঙ্গ

  • জন্ম স্থানের সঠিক ঠিকানা

জন্ম স্থানের ঠিকানা প্রদানের সময় ঠিকানাটি ধাপে ধাপে সিলেক্ট করতে হয়। অর্থাৎ আপনার জন্ম যদি  রাজশাহী জেলার  পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বের ইউনিয়নে হয়, সেক্ষেত্রে প্রথমে রাজশাহী  বিভাগ সিলেক্ট করতে হবে। এরপর রাজশাহী  জেলা, তারপর পুঠিয়া  উপজেলা, তারপরেই বানেশ্বের  ইউনিয়ন সিলেক্ট করতে হবে। গ্রাম ও বাড়ীর নাম এন্টার করতে হবে। এই ফর্ম পূরণ শেষ হলে “পরবর্তী” বাটনে ক্লিক করতে হবে । 

৪র্থ ধাপ :

এরপর আরেকটি নতুন ফর্ম আসবে । এই ফর্মে ব্যবহারকারীর পিতামাতার তথ্য প্রদান করতে হবে। এখানে নিবন্ধনকারীর জন্ম সাল, পিতা / মাতার জন্ম সনদ নাম্বার প্রদান করতে হবে কিংবা শুধুমাত্র পিতা ও মাতার নাম প্রদান করলে হবে। যদি পিতা ও মাতার নাম লেখার অপশন খোলা থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট টেক্সট বক্সগুলোতে মাতা ও পিতার নাম ইংরেজি ও বাংলা, উভয় ভাষাতে লিখতে হবে।

 

মা ও বাবার নাম লেখার অপশন না থাকলে প্রথমে পিতা ও মাতার জন্ম সনদ বের করতে হবে। তবেই সন্তানের জন্ম সনদের আবেদন করা যাবে। নাম বা জন্ম সনদের নাম্বার সঠিকভাবে প্রদানের পর মা ও বাবার জাতীয়তা সিলেক্ট করুন।

 

৫ম  ধাপ :

এবার  নিবন্ধনকারীর ঠিকানা প্রদানকরতে হবে। এরপর জন্মস্থানের ঠিকানা ও স্থায়ী ঠিকানা লেখার অপশন দেখতে পাবেন।সেক্ষেত্রে জন্ম স্থানের ঠিকানা লিখার পর “জন্মস্থানের ঠিকানা ও স্থায়ী ঠিকানা একই” অপশন সিলেক্ট করুন। সেক্ষেত্রে দুইটি ঠিকানা একইসাথে একই হয়ে যাবে। ঠিকানা লিখার পর “পরবর্তী” বাটনে ক্লিক করুন।

 

৬ষ্ঠ  ধাপ :

এরপর আবেদনকারীর তথ্য প্রদান করতে হবে। এখানে নিবন্ধনকারীর বয়স যদি ১৮ এর বেশি হয় তবে “নিজ” অপশন সিলেক্ট করে নিজের জন্ম সনদের আবেদন নিজে করা যাবে। নিবন্ধনকারীর বয়স ১৮ এর কম হলে সেক্ষেত্রে আবেদনকারীর সাথে নিবন্ধনকারীর সম্পর্ক এবং উক্ত ব্যক্তির ইমেইল ও ফোন নাম্বার প্রদান করতে হবে।

 

৭ম ধাপ :

এরপর নিবন্ধনকারীর পরিচয় প্রমাণস্বরুপ যেকোনো কাগজ এটাচমেন্ট হিসেবে এড করতে হবে। ফাইল আপলোড শেষে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে গেলে সকল তথ্য একইসাথে দেখতে পাবেন। এখান থেকে প্রদত্ত তথ্য সম্পূর্ণ সঠিক কিনা তা আরেকবার চেক করে নিন। এরপর “সাবমিট” বাটনে ক্লিক করুন।

 

 ৮ম ধাপ:

অনলাইন আবেদন সম্পন্ন হলে প্রাপ্ত আবেদনপত্রটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করতে হবে। অতঃপর এর সাথে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো সংযুক্ত করে নিকটস্থ স্থানীয় সরকারের কার্যালয়ে সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন ফি সহ জমা দিতে হবে।

 

৯ম ধাপ:

জন্ম নিবন্ধনের আবেদন সাবমিট করার পর একটি আবেদন নাম্বার দেওয়া হবে। এই নাম্বার দ্বারা জন্ম নিবন্ধন আবেদনের বর্তমান অবস্থা দেখা যাবে https://bdris.gov.bd/br/application/status এই লিংকে প্রবেশ করে।

জন্ম নিবন্ধন-এর জন্য প্রয়োজনীয় ফি ও সময়:

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আবেদনপত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা/ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে জমা দেয়ার সময় জন্ম নিবন্ধন ফি প্রদান করতে হবে। সাধারণত আবেদনের দিন থেকে  ৫ কর্ম দিবসের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন সনদ তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু জন্ম সনদটি হাতে পেতে মাস খানেকের মত সময় লেগে যায় ।

  • ৪৫ দিন বয়সী শিশুর জন্ম নিবন্ধন বিনামূল্যেই করা যাবে।

  • ৪৬ দিন থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের জন্য ২৫ টাকা ফি।

  •  দেশের বাইরে থেকে জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ফি ১ মার্কিন ডলার।

  • জন্ম সনদ সংশোধন ফি ১০০ টাকা। দেশের বাইরের প্রার্থীদের জন্য ২ মার্কিন ডলার।

  • বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষাতেই মূল সনদ পেতে বা তথ্য সংশোধনের পর সনদের কপি পেতে সম্পূর্ণ ফ্রিতেই করা যাবে।

  • কিন্তু বাংলা-ইংরেজি দুটো ভাষাতেই জন্ম নিবন্ধন সনদের নকল পেতে ৫০ টাকা এবং দেশের বাইরের প্রার্থীদেরকে ১ মার্কিন ডলার ফি দিতে হবে।

আরো পড়ুন :ভোটার নিবন্ধন করা ও অনলাইনে আইডি কার্ড বের করার নিয়ম

পরিশেষে :

বলা যাই যে ,জন্ম নিবন্ধন  প্রত্যেক নাগরিকের জন্য অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সনদ। এজন্য এটি সতর্কতার সাথে সঠিক ও নির্ভুল ভাবে তৈরি করা উচিত। আশা করি ,উপরোক্ত আলোচনা আপনাদের  সঠিকভাবে জন্ম নিবন্ধন তৈরিতে সাহায্য করবে। 

Write A Comment