আসসালামু আলাইকুম আশা করি আল্লাহর অশেষ রহমতে সবাই ভালো আছেন। বাংলাদেশে অনেক মানুষেরই ভূমি আইন সম্পর্কে খুব বেশি জানা নাই। ফলে তারা জমি নিয়ে নানা ধরনের প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হয়ে থাকে । জমি রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক।  রেজিস্ট্রেশন আইন ২০০৪ (সংশোধিত) অনুযায়ী, প্রায় সকল দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।আইন অনুযায়ী দলিল রেজিস্ট্রি করা হলে মালিকানা নিয়ে কোনো ঝামেলা থাকে না।

আইন অনুযায়ী দলিল রেজিস্ট্রি করা থাকলে মালিকানা নিয়ে বিরোধ এড়ানো যায়। এছাড়া জমি রেজিস্ট্রি করা থাকলে পরবর্তীতে বিক্রি, দান, উইল করা সহজ হয়। স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় দলিল অবশ্যই লিখিত হতে হবে। এখান আমরা জমি রেজিস্ট্রেশন নিয়ে বিশদ আলোচনা করব।

দলিল কি :

দলিল হচ্ছে একটি আইনি নথি, যেখানে সম্পদের ক্রয়-বিক্রয়, চুক্তি কিংবা অন্য কোন দায় সৃষ্টি করে এবং পক্ষদ্বয়ের বা পক্ষগুলোর সম্মতি লিপিবদ্ধ করা থাকে। 

জমির দলিলের প্রকার:

প্রচলিত আইন অনুযায়ী দলিল অনেক প্রকারের হতে পারে ।তবে বাংলাদেশ ভূমি আইন অনুযায়ি জমির দলিল মোট ৯ধরনের হয়ে থাকে।

  • সাফ-কবলা দলিল
  • দানপত্র দলিল
  • বন্টন নামা দলিল 
  • হেবা দলিল
  • হেবা বিল এওয়াজ দলিল
  • এওয়াজ দলিল
  • অসিয়তনামা দলিল
  • উইল দলিল
  • না-দাবি দলিল

কোন কোন দলিল রেজিস্ট্রেশন করতে হবে 

  • বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। যেমন- বিক্রয় দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হয় ।
  • জমি ক্রয় করার আগে বায়না দলিল করা হলে ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশনের জন্য জমা দিতে হবে। রেজিস্ট্রি ছাড়া বায়না দলিলের আইনগত ভাবে কোনো মূল্য নেই।
  • বায়না দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে এক বছরের মধ্যে বিক্রয় দলিল সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দাখিল করতে হয় ।
  •  বন্ধককৃত জমির দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে।
  • হেবা বা দানকৃত সম্পত্তির দলিলও রেজিস্ট্রি করতে হবে।
  • কোনো ভূমি সম্পত্তি মালিকের মৃত্যু হলে তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বাটোয়ারা করা এবং ওই বাটোয়ারা বা আপস বণ্টননামা অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে।

রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

দলিল রেজিস্টার করার জন্য দাখিলের সময় নিম্নলিখিত কাগজপত্রে মূল কপি প্রদর্শন এবং এদের একসেট ফটোকপি এল. টি. নোটিশের সাথে (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) সংযুক্ত করতে হবে-

  • সংশ্লিষ্ট জমির সি.এস/ এস.এ/ আর.এস (বি. আর. এস) ও নামজারী খতিয়ানের মূল কপি অথবা সহি মোহরীয় নকল। আপনার কাছে যদি খতিয়ানের মূল কপি না থাকে বা হারিয়ে কিংবা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র থেকে আবেদন করে জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুমের খতিয়ান সংগ্রহ করতে পারেন।
  • জমির মাঠ পর্চা। এটি আপনি সংশ্লিষ্ট উপজেলার সেটেলমেন্ট অফিসারের কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করে নিতে পারেন । দাগ অথবা খতিয়ান নাম্বার জানা থাকলেই মাঠ পর্চা সংগ্রহ করা যাবে।
  • জমির দাখিলা। হাল সন পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ণ কর অর্থাৎ খাজনা পরিশোধের রশিদ, যাকে দাখিলা বলা হয়। ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তার (তহশিলদারের) কার্যালয় থেকে আপনি দাখিলা সংগ্রহ করতে পারেন।
  • ওয়ারিশ সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)। অংশিদার জমি ক্রয়-বিক্রয় করার ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ অবশ্যই প্রয়োজন হয়। ইউনিয়ন পরিশোধ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করতে হয় ।
  • প্রয়োজনীয়  বায়া দলিল সমূহ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)। দলিল দাতা যদি ক্রয়কৃত জমির দলিল সম্পাদন করেন তাহলে ক্রয়কৃত দলিলগুলোর প্রয়োজন হয়। 
  • দাতা ও গ্রহীতার জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্ম সনদপত্র।
  • দাতা/সম্পাদনকারী/ গ্রহিতাগণের সদ্যতোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
  • TIN (টি. আই. এন) সার্টিফিকেট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।

রেজিস্ট্রির আইন ও ফি:

জমি রেজিস্ট্রেশন আইন, স্ট্যাম্প আইন, আয়কর আইন, অর্থ আইন ও রাজস্বসংক্রান্ত বিধি এবং পরিপত্রের আলোকে দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। সব দলিলের রেজিস্ট্রি ফি সমান নয়। সরকার বিভিন্ন সময় সমসাময়িক বিবেচনা অনুযায়ী রেজিস্ট্রি ফি নির্ধারণ করে থাকে।

জমি রেজিস্ট্রি করার নিয়ম :

জমি রেজিস্ট্রি করার সময় উভয় পক্ষকে ০২জন করে ০৪জন সাক্ষী নিয়ে যেতে হবে। জমি রেজিস্ট্রি করার ক্ষেত্রে দুই পক্ষকে জমি রেজিস্ট্রির সময় রেজিস্ট্রি অফিসে যেতে হবে।  জমি রেজিস্ট্রি প্রকিয়া পুরো করার জন্য জমি জামা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সঠিক ভাবে বয়ান মাফিক উল্লেখ করার জন্য এক জন উকিল বা মোহরী (দলিল লেখক) জোগাড় করতে হবে। 

জমি রেজিস্ট্রি করার সময় সতর্কতা :

জমি রেজিস্ট্রি করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। প্রত্যেকটি  উপজেলায় সাবরেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে। সেখানে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়।ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসে বিক্রীত জমির তফসিল নিয়ে জমিটি আগে বিক্রি হয়েছে কি না, আগে অন্য কারো নামে নামজারি আছে কি না, বিক্রয়ে উল্লিখিত দাগ, খতিয়ান, নকশা ঠিক আছে কি না এবং সর্বোপরি সরেজমিনে বিক্রীত জমি আছে কি না তার খোঁজ পাওয়া যাবে। প্রয়োজনে ভূমি অফিস থেকে সার্ভেয়ার (আমিন) নিয়ে জমি মেপে জমি ক্রয় করা উচিত হবে।উত্তরাধিকার সূত্রে সব সম্পত্তি বিক্রয় করার ক্ষেত্রে দাতার নামে নামজারি বাধ্যতামূলক।২০০৪ সালের রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধনের পর মৌখিক দান বৈধ হবে না ।

আরো পড়ুন :ডিগ্রী রেজাল্ট দেখার নিয়ম ও ডিগ্রীর রেজাল্ট কখন হয়।

পরিশেষে:

বলা যাই যে এই আর্টিকেলটি দলিল রেজিস্ট্রি করার ক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করবে।তবে এই ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করা ব্যাপারে জোর দেন আইনজীবীরা। সাধারণত জায়গা-জমি ক্রয়ের আগে বেশিরভাগ মানুষ আইনজীবীদের সাথে কোনো পরামর্শ করেন না।আইনজীবীদের পরামর্শ না নিলেও জমি সংক্রান্ত ভালো জ্ঞান আছে এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন।

Write A Comment